মানব সভ‍্যতার জন্য অপেক্ষা করছে মহাপ্রলয়ের মতো অবস্থা

Published by admin on


গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈষ্ণিক উষ্ণায়ন:

সহজ ভাষায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারই বৈষ্ণিক উষ্ণায়ন।
তবে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির একটি প্রক্রিয়া আছে আর তা হলো- সূর্য থেকে ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ‍‍্যের তাপ বায়ুমন্ডল ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে আপতিত হয়।এসময় বায়ুমন্ডলের গ্রীন হাউজ গ‍্যাসসমূহ কোনো বাঁধা দেয় না। ভূপৃষ্ঠ ও সমুদ্র পৃষ্ঠ প্রয়োজনীয় তাপ শোষণের পর তা ছেড়ে দেয়। শোষণের পর অতিরিক্ত তাপ পূনরায় মহাশূন‍্যে ফিরে যেতে চায়।মজার ব‍্যাপার হলো,এই তাপ এবার বৃহৎ তরঙ্গদৈর্ঘ‍্য আকারে মহাশূন‍্যে ফিরে যেতে চাইলে বায়ুমন্ডলে অবস্থিত গ্রীন হাউজ গ‍্যাস তাতে বাধা দেয় এবং সেই তাপ পূনরায় পৃথিবীতে ফেরত পাঠায়। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যায় যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈষ্ণিক উষ্ণায়নের প্রধান কারন।

জাতাসংঘের গ্লোবাল ওয়ার্মিং রিপোর্ট -2018 তে যা বলা হয়েছে :

গত 08.10.2018 তারিখে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে জাতিসংঘে নিয়োজিত Intergovernmental panel on clymet change (IPCC) এর রিপোর্টে বলা হয়, প্রথম বারের মতো পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে 1 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড।তাপ কমার পরিবর্তে গ্রিন হাউজ গ‍্যাস নির্গমন বৃদ্ধি পাওয়ায় তাপমাত্রা বেড়ে পৃথিবী হয়ে উঠছে ক্রমশ জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড। মানব সভ‍্যতার জন্য অপেক্ষা করছে মহাপ্রলয়ের মতো বিপর্যয়।মহাপ্রলয়ের আশঙ্কায় ভূগছে এ সবুজ মানবগ্রহটি। আগামী দশ বছরের মধ‍্যেই ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়বে পৃথিবী। অবিলম্বে ব‍্যবস্থা না নিলে 2030 সালের মধ্যেই এ তাপমাত্রা পৌঁছে যাবে দেড় ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে। আর সেটা ঘটলে বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন এ‍্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল‍্যান্ডের বরফের পাহাড় দ্রুত গলবে।দক্ষিন গোলার্ধের তাপমাত্রা বাড়লে তার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বেই। পাহাড়সম হিমশৈল তথা বরফের পাহাড় হতে বরফের চাই গলে সমুদ্রের পানিতে মিশবে।এমনিতে প্রতিবছর সমুদ্রের পানির উচ্চতা ইঞ্চিতে নয়,ফুট হিসেবে বাড়ছে।সমুদ্র উপকূলের দ্বীপগুলো ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মেট্রোপলিটন শহরগুলো হবে আরও উত্তপ্ত। এভাবে চলতে থাকলে 2100 সালের মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা 2 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কি ঘটতে পারে :

বিভিন্ন গ্রিন হাউজ গ‍্যাস যেমন-কার্বন ডাই অক্সাইড,মিথেন,সিএফসি,ওজোন,নাইট্রাস অক্সাইডও জলীয় বাষ্প বায়ুমন্ডলে বতর্মান থাকায় পৃথিবীপৃষ্ঠ হতে তাপকে প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন‍্যে ফিরে যেতে দেয় না। ফলে ভৃপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। একদিকে মরুকরন শুরু হবে অন‍্যদিকে উত্তর মেরুর বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। এ শতাব্দীতেই বেড়েছে প্রায় 4–10 ইঞ্চি। এভাবে চলতে থাকলে আগামী শতাব্দীতে বাংলাদেশ,সুন্দরবনঅঞ্চল,নেদারল‍্যান্ড,শ্রীলংকা,হল‍্যন্ড,ফ্লোরিডা,ভারতের কিছু অঞ্চল গোয়া,ত্রিপুরা,মিজোরামসহ সমুদ্র উপকূলবর্তী বহু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে। মানুষ হারাবে বাসস্থান। ঘটবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলাফলে কি ঘটতে পারে :

বতর্মানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা 15.4 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ এ হারে বাড়তে থাকলে 2150 সাল নাগাত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে প্রায় 3.8 ডিগ্রী যা 2150 সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দাঁড়াবে 20.2 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে। যার ফলে সাইক্লোন,সুপার সাইক্লোন,টর্নেডো,সুনামি,ফনি, আম্পানের মতো ঝড়গুলো আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠবে। বনভূমিতে দাবানলের ফলে বনভূমি উজাড় হবে। উত্তর গোলার্ধের মধ‍্য অক্ষাংশের দেশগুলোতে প্রবল খরা দেখা দিবে।ফলে উত্তর আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশগুলোতে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাবে। পৃথিবীতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। উচ্চ তাপমাত্রা সহ‍্য করতে না পারায় অনেক প্রানী বিলুপ্ত হবে। ইকোসিস্টেম ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।নদী,পুকুর,হাওরের পানি শুকিয়ে জলজ উদ্ভিদ-প্রানীর প্রজননক্ষমতা হারিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হবে। ইতিমধ্যে এইসব প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে যা আমরা নিজেরায় অবলোকন করছি।

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ফলে ভবিষ্যতে কি হতে পারে :

1800–1900 সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় 0.4 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড।1900–2000 সালে বেড়েছে 1 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। 2030 সালের মধ্যে যদি 1.5 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বেড়ে যায় তবে আমরা অনেকেই পৃথিবীর প্রাকৃতিক এ বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে যেতে পারি। বর্তমান হারে কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়তে থাকলে 2150 সালে বাড়বে প্রায় 3.8 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড।আর 2250 সাল নাগাত পৃথিবীর তাপমাত্রা এত বেড়ে যাবে যে, সুমেরু ও কুমেরু প্রদেশের বরফ প্রায় গলে যাবে। তখন পরিস্থিতি দাঁড়াবে আজ থেকে প্রায় 1,30,000 বছর আগেকার মতো,যখন মেরু অঞ্চলের বরফগলা পানির প্রভাবে সমুদ্রের উপরিতল ছিল আজকের অবস্থা হতে 6 মিটার বেশি উচ্চতায়।তবে এটা নিশ্চিত যে,এ শতাব্দীর শেষ নাগাত মানুষ এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

সূর্যরশ্মির বিকিরিত শক্তির কোথায় কতটুকু ব‍্যয় হয় :

পৃথিবীপৃষ্ঠের আপতিত সূর্যরশ্মির 34% ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন‍্যে ফিরে যায়। বায়ুমন্ডল, স্থলভাগ ও সমুদ্র কর্তৃক 42% শোষিত হয়।পানিকে বাষ্পীভূত করতে এবং জলীয় বাষ্পকে পানি চক্রে প্রবাহমান রেখে কার্যকর করতে 23% ব‍্যয়িত হয়। বায়ুপ্রবাহ অব‍্যাহত রাখতে ও সমুদ্রের পানির প্রবাহ অব‍্যাহত রাখতে ব‍্যয় হয় 1% এরও কিছু কম। আর সালোকসংশ্লেষণে ব‍্যয় হয় প্রায় 0.023%.

তাহলে মহাপ্রলয় থেকে মুক্তির উপায় কি!    উপায় দুটি।

১. কার্বন ডাই অক্সাইড গ‍্যাস তথা গ্রিন হাউজ গ‍্যাসের নির্গমণের হার কমাতে হবে।
২. এমন কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে যাতে গ্রীন হাউজ গ‍্যাস শোষণ করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা কার্বন ডাই অক্সাইড গ‍্যাস নির্গমণের হার কমানোর জন্য সৌরশক্তি ও জলবিদ‍্যুতের ব‍্যবহার ব‍্যাপকহারে বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা আশাবাদী,এসব করতে পারলে অন্তত 2050 সালের মধ্যেই পুনরায় জলবায়ুর ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

 

সোর্স : জ্ঞানের বিশ্বায়ন

ফারুক আল মামুন


0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *