মানুষের মধ্যে ৮ ধরনের বুদ্ধিমত্তা থাকে 

Published by admin on


১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডক্টর হাওয়ার্ড গার্নার একটি তত্ত্ব প্রদান করেন। যাতে তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে ৮ ধরনের বুদ্ধিমত্তা থাকে।

এই ৮ ধরনের বুদ্ধিমত্তা জানার পূর্বে,আসুন আমরা আরো কিছু বিষয়ে আলোকপাত করি। অনেক বিদ্যালয়ে দেখা যায় কিছু শিক্ষার্থী আছে যারা পড়াশোনায় দুর্বল ও অমনোযোগী কিন্তু খেলাধুলা বা ছবি আঁকা বা সঙ্গীতে বা গল্প কবিতা লেখা বা অন্যান্য কার্যক্রমে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে। তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষক ও অভিভাবক তাদের এই কাজগুলো কে ভালো চোখে দেখেনা। তাদের পড়াশোনার প্রতি অধিক প্রেসার দেওয়া হয়।ফলে তাদের সেই প্রতিভাগুলো বিকশিত হতে পারে না আবার পড়াশোনায়ও খুব ভালো করতে পারে না।এক সময় তারা নিরবে ঝরে পড়ে।

আবার অনেকেই আছে শুধু পড়াশোনাতেই ব্রিলিয়ান্ট কিন্তু অন্য কোন বিষয়ে কিছু করতে পারে না এবং কিছু আছে যারা পড়াশোনাতে যেমন ব্রিলিয়ান্ট তেমনি অন্য সকল বিষয়েও পারদর্শী।

সবারই কিছু না কিছু প্রতিভা থাকে। কেউ ছবি আঁকে ভালো, কেউ খেলাধুলায় ভালো,কেউ গল্প কবিতায় আবার কেউবা লেখাপড়ায় ভালো।বিদ্যালয়গুলোতে শুধু লেখাপড়ার প্রতি জোর দেয়া হয় কিন্তু অন্যান্য প্রতিভা বিকাশে জোর দেওয়া হয় না।এতে প্রতিভাগুলো অঙ্কুরেই ঝরে যায়।

আজ আমি আপনাদের দেখাবো কিভাবে পড়াশোনার মাধ্যমে এসব প্রতিভার বা বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সাধন করা যায়।এজন্য প্রয়োজনে বিদ্যালয়ের শ্রেণী পাঠদানে বিশেষ পদ্ধতি বা কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। যাতে সকল ধরনের প্রতিভার বা বুদ্ধমত্তার শিক্ষার্থীদের বিকাশ সাধন হতে পারে। এটা শুধু শিক্ষকদের জন্য না, যারা নিজেদের সন্তানের নিজেরা অনেক কেয়ার করেন তারাও প্রয়োগ করতে পারেন।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে স্কুল পর্যায়েই ছাত্রছাত্রীদের তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভার আলোকে রাষ্ট্রের নিয়ম মোতাবেক শ্রেণিতেই তাদের শ্রেণীভেদ করে বিভিন্ন সেক্টরে প্রদান করে থাকে।

এখন আসুন আমরা জেনে নেই ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডক্টর হাওয়ার্ড গার্ডনার যে তত্ত্ব প্রদান করেন, সে তত্ত্বের আলোকে মানুষের মধ্যে যে ৮ ধরনের বুদ্ধিমত্তা থাকে সেগুলো জেনে নিই।

তিনি বলেন – মানুষের মধ্যে ৮ ধরনের বুদ্ধিমত্তা থাকে।সেগুলি হলো :

১. ভাষাভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা:
সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারা,বক্তৃতা করতে পারা, কোন কিছু ব্যাখ্যা করতে পারা,কোন কিছু রচনা করতে পারা ইত্যাদি।

২. যুক্তিমূলক – গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা:
কোন ব্যাপারে যুক্তি প্রদান করতে পারা, বিতর্কে যোগ্যতা প্রদর্শন করা, বিচার বিশ্লেষণ করতে পারা, অংক করতে পারা, সমস্যার সমাধান করতে পারা, বিমুর্ত বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারা ইত্যাদি।

৩.দর্শনীয় অবস্থানমূলক বুদ্ধিমত্তা:
আনুপাতিক দিক ঠিক রেখে ছবি অঙ্কন করতে পারা, ছবি ব্যাখ্যা করতে পারা,সাজাতে পারা,মানচিত্র নকশা চার্ট বুঝতে পারা, কোন কিছুর চিত্র কল্পনা করতে পারা,প্রতিকৃতি বানাতে পারা ইত্যাদি।

৪. অনুভূতি ও শরীরবৃত্তীয় বুদ্ধিমত্তা:
শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরচর্চা মূলক কাজকর্ম যেমন- দৌড়,সাঁতার ইত্যাদি ও খেলাধুলা যেমন- ক্রিকেট,ফুটবল, হাডুডু ইত্যাদিতে যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রদর্শন এবং হস্তশিল্পে দক্ষ কর্মকার, সূতার,চাষী, কাঠুরিয়া প্রভৃতি পেশার ব্যাক্তিদের ক্রিয়া-কলাপে ব্যবহৃত বুদ্ধি।

৫. ছন্দও সঙ্গীতমূলক বুদ্ধিমত্তা:
গান- বাজনা, অঙ্গভঙ্গি, নৃত্য প্রকৃতির বিভিন্ন শব্দ সহজে অনুধাবন ইত্যাদি ক্রিয়াকলাপে পারদর্শিতা প্রদর্শন।

৬.আন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা:
অন্যের সহিত সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারা, অন্যের আস্থা অর্জন করতে পারা, নেতৃত্ব দান করতে পারা, নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারা, সহাবস্থানে বসবাস করতে পারা, ভালোবাসা অর্জন করতে পারা, অন্যের কাজে সহযোগিতা করা, সামাজিক অবস্থা বুঝতে পারা, অন্যের অবস্থা বুঝতে পারা ইত্যাদি।

৭.অন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা :
আত্মসচেতন হওয়া, আত্মোপলব্ধি করতে পারা, ভারসাম্য বজায় রেখে চলার যোগ্যতা,একা একা অধ্যায়ন করে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা, নিজের সবলতা ও দূর্বলতা বুঝতে পারা,অধিক চিন্তা করা,একা একা কাজ করতে ভালোবাসা ইত্যাদি।

৮.প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা:
প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থা ও গতিতে খাপ খাইয়ে চলার যোগ্যতা,সৌন্দর্যবোধ, প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে পারা, প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের তথ্য সংগ্রহ করা, প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে গবেষণা করা, প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদি।

উপরোক্ত বিষয়গুলি শিক্ষার্থীদের সকল ধরনের প্রতিভা বা বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য পাঠকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে করে এই পাঠের মাধ্যমে উপরের সকল বা অধিকাংশ বুদ্ধির চর্চা হয়।এতে করে সব ধরনের প্রতিভা বা বুদ্ধিমত্তার শিক্ষার্থীদের বিকাশ ঘটবে। কিভাবে এ সকল বুদ্ধিমত্তা চর্চা উপযোগী করে পাঠ উপস্থাপন করা যায় তার একটি উদাহরণ আলোচনা করা যাক।

☆ উদাহরণস্বরূপ- প্রথমে পাঠকে উপরের বুদ্ধিমত্তা অনুসারে কয়েকটি অংশে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে এবং সেভাবে প্রতিটি অংশের উপস্থাপন করা যেতে পারে।

যেমন: অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহ নীতি শিখানোর জন্য যা করতে পারেন-

• পুস্তক পাঠ- (ভাষাভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা)

• গাণিতিক সূত্র যা এখানে প্রযোজ্য- (যুক্তিমূলক- গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা )

• এ নীতির গ্রাফিক চিত্র পরীক্ষা পর্যালোচনা- (দর্শনীয় অবস্থান মূলক বুদ্ধিমত্তা)

• বাস্তব জগতে এর প্রতিফলন পর্যবেক্ষণ-( প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা )

• ব্যবসায়ী মহলে ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক (আন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা)

• এই চাহিদা ও সরবরাহ নিজের দেহে পরীক্ষা( যখন পেটে খাবার দেন তখন চাহিদা কমে যায়,খাবার কম দিলে পেট খাবার চায় আপনি ক্ষুধা বোধ করেন )- (অন্তঃব্যক্তিক ও অনুভূতি ও শরীরবৃত্তীয় বুদ্ধিমত্তা)

• এ নীতি সম্পর্কীয় ওকে একটি গানও লিখে শোনাতে পারেন-( ছন্দ ও সঙ্গীতমূলক বুদ্ধিমত্তা)

একই পাঠে সবধরনের বুদ্ধিমত্তার উপাদান আসতে হবে তা কখনোই নয়।বিষয়ভিত্তিক পাঠে যে ধরনের বুদ্ধিমত্তার উপাদান সর্বাধিক আনা যায় সেভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

যেমন- ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয়:

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল = 1/2 × ভূমি × উচ্চতা।

• এটা প্রমাণের জন্য চিত্র অংকন, যুক্তি দিয়ে প্রমান করা-( যুক্তিমূলক ও গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা)

• লিখে প্রকাশ করা -(ভাষাভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা)

• চিত্র প্রদর্শন করে বিষয় অনুধাবন-( দর্শনীয় অবস্থানমূলক বুদ্ধিমত্তা)

• কোন একটি স্থানে যেয়ে একটি ত্রিকোণাকার জমির চিত্র করে ক্ষেত্রফল বের করা -(প্রাকৃতিক ও শরীরবৃত্তীয় বুদ্ধিমত্তা)

• অপর ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেওয়া -(আন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা)

• বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা বা চিন্তা করা- (অন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা)

কার্টেসি:   প্রভাষক একাব্বর


0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *